রবিবার, ৭ মার্চ, ২০১০

পুকুরে দেশি মাগুরের চাষ

magur

দেশি মাগুর একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ ও সুস্বাদু মাছ। রোগীর পথ্য হিসাবে মাছটির চাহিদা রয়েছে অনেক। এক সময় এই মাছটিকে সহজেই প্রাকৃতিক জলাশয়ে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন দেশি মাগুর আর তেমন পাওয়া যায় না। তাই মাছটি প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। তবে আশার কথা হল দেশের মাছ চাষিরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এই মাছটিকে ফিরিয়ে এনেছে।
ডিম সংগ্রহের পরবর্তী ব্যবস্থাপনা : ডিম সংগ্রহের পর ডিমগুলোকে সিস্টার্নে নিয়ে যেতে হবে। সিস্টার্নের আকার আয়তকার হতে হবে। দৈর্ঘ্যে ৮ ফুট এবং প্রস্থে ৪ ফুট হলে ভাল। সিস্টার্নের পানির উচ্চতা ৩ ইঞ্চির বেশি দেয়া উচিৎ নয়। ডিমগুলোকে পাখির পালক দিয়ে আস-ে আস-ে সিস্টার্নে বিছিয়ে দিতে হবে। মাগুরের ডিম আঠালো আর সেজন্য ডিমগুলোকে এমনভাবে বিছাতে হবে যেন একটি ডিম আরেকটি ডিমের সাথে লেগে না যায়।
তারপর আধা ইঞ্চি পি.ভি.সি. পাইপ ছিদ্র করে পানির ঝর্ণার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দেশি মাগুরের ডিম ফুটতে কার্প জাতীয় মাছের চেয়ে সময় বেশি লাগে। তাপমাত্রা ভেদে ৩০ থেকে ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগে। এই দর্ীঘ সময়ে মাগুর মাছের ডিমে ফাঙ্গাস আক্রমণ করতে পারে। ডিমে ফাঙ্গাস আক্রমণ করার সাথে সাথে ওই ডিমগুলোকে সিস্টার্ন থেকে সাইফনের মাধ্যমে ফেলে দিতে হবে। অন্যথায় অত্যন- দ্রুত গতিতে এই ফাঙ্গাস এক ডিম হতে অন্য ডিমে ছড়িয়ে গিয়ে সমস- ডিমকে নষ্ট করে ফেলতে পারে। সেজন্য ডিমগুলোকে সিস্টার্নে ঘন করে দেয়া যাবে না। যথাসম্ভব পাতলা করে দিতে হবে। এই সময় ঠাণ্ডা পানির ঝর্ণার সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা রাখতে হবে। পানির তাপমাত্রা ২৭/২৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট রাখতে হবে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে_ পানির তাপমাত্রা এর চেয়ে বেশি হলে দেশি মাগুরের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়েও পরে বাচ্চা মারা যায়। এভাবে ডিম থেকে বাচ্চা বের হওয়ার পর বাচ্চাগুলো আপনা আপনি সিস্টার্নের কোণায় যেতে থাকবে। সিস্টার্নের কোণায় অবস্থান নিলেই সাধারণত বাচ্চার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যায়। বাচ্চাগুলো কোণায় অবস্থান নিলে সিস্টার্নের মাঝখানের ময়লা, ধূলাবালি সাইফনের মাধ্যমে পরিষ্কার করে দিতে হবে। এভাবে বাচ্চার বয়স ৭২ ঘণ্টা পার হলেই এদেরকে কৃত্রিম খাবার দিতে হবে। এই সময় খাবার হিসাবে ছোট জু-প্ল্যাংকটন জীবিত অবস্থায় সিস্টার্নে দিতে হবে। এই জু-প্ল্যাংকটন পুকুর থেকে জীবিত অবস্থায় ধরে সংগ্রহ করে তারপর সিস্টার্নে দিতে হবে। সিস্টার্নে দু'দিন এই খাবার খাওয়ানোর পর নার্সারি পুকুরে স্থানান-র করতে হবে।
রেনু উৎপাদনকালীন সতর্কতা : ১. দেশি মাগুরের ব্রুডমাছ অবশ্যই পরিপক্ক হতে হবে। অন্যথায় সমস- কাজই বিফলে যাবে।
২. চাপ প্রয়োগে ডিম সংগ্রহের সময় খুব বেশি চাপ দিয়ে ডিম বের করা উচিৎ নয়। তাতে ডিম ভেঙ্গে যেতে পারে।
৩. সিস্টার্নে ডিম যেন অধিক ঘনত্বে দেয়া না হয় সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। অর্থাৎ একটি ডিম আরেকটি ডিমের সাথে যেন লেগে না যায়।
৪. সিস্টার্নের ঠাণ্ডা পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। পানির তাপমাত্রা ২৭/২৮ ডিগ্রির বেশি হলে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলেও মারা যাওয়ার সম্ভবনা থাকে।
এভাবে চাহিদা অনুযায়ী যে কেউ দেশি মাগুরের রেনু উৎপাদন করতে পারেন। (শেষ)
_এ.কে.এম. নূরুল হক
ব্রহ্মপুত্র ফিস সিড কমপ্লেক্স (হ্যাচারি)
চর পুলিয়ামারী,শম্ভুগঞ্জ, ময়মনসিংহ

কীভাবে চিনবেন ভেজাল সার?

ফসল উৎপাদনে সার একটি অন্যতম উপকরণ। বর্তমানে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে অতিরিক্ত মুনাফা লাভের জন্য অসাধু ব্যবসায়ীরা সার, কীটনাশকে ভেজাল দিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় গড়ে উঠেছে এসব ভেজাল কারখানা। সরকারের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা উৎপাদন করে বাজারজাত করছে সেসব ভেজাল সামগ্রী। যাতে ক্ষতিগ্রস- হচ্ছে আমাদের দেশের কৃষি ও কৃষক। কয়েকটা দিকে খেয়াল রাখলেই কৃষক নিজেরাই ভেজাল সার সনাক্ত করতে পারবেন। সার কেনার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে_ ১. সারের বস-ায় সিল এবং সেলাই ঠিক আছে কিনা, ২. সার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা কিনা, ৩. সার তৈরির তারিখ ও ব্যবহারের শেষ তারিখ ঠিক আছে কিনা, ৪. বস-ার ভেতর সার দলা পাকিয়ে বা গলে গেছে কিনা, ৫. সারের আকার ঠিক আছে কিনা, ৬. বস-ায়/প্যাকেটের ওজন ঠিক আছে কিনা, ৭. কেনার পর দোকানের রশিদ নেয়া। উল্লেখিত বিষয়গুলো দেখে নেয়ার পরও যেভাবে ভেজাল সার পরীক্ষা করতে হবে_
ইউরিয়া : আসল ইউরিয়া সারের দানাগুলো সমান হয়। তাই কেনার সময় প্রথমেই দেখে নিতে হবে ইউরিয়া সারের দানাগুলো সমান আছে কিনা? ইউরিয়া সারে কাঁচের গুঁড়ো অথবা লবণ মেশানো হয়। আসল এক চামচ ইউরিয়া সার দু'চামচ পানির মধ্যে দিলে তাৎক্ষণিকভাবে গলে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈরি করবে এবং এ দ্রবণে হাত দিলে ঠাণ্ডা অনুভূত হবে। চা চামচের অল্প পরিমাণ ইউরিয়া সার নিয়ে তাপ দিলে এক মিনিটের মধ্যে এ্যামোনিয়ার ঝাঁঝালো গন্ধ হয়ে গলে যাবে। যদি ঝাঁঝালো গন্ধসহ গলে না যায় তবে বুঝতে হবে সারটি ভেজাল।
টিএসপি : আসল টিএসপি সার পানিতে মেশালে সাথে সাথে গলে যাবে না। কিন্তু ভেজাল টিএসপি সার পানির সাথে মেশালে অল্প সময়ের মধ্যেই গলে যাবে। আসল টিএসপি এক চামচ আধা গ্লাস পানিতে মেশালে ৪/৫ ঘণ্টা পর ডাবের পানির মত পরিষ্কার দ্রবণ হবে। ভেজাল থাকলে অল্প সময়েই ঘোলা দ্রবণ তৈরি হবে।
এসএসপি : এক চা চামচ এসএসপি সার আধা গ্লাস পানিতে মেশালে নমুনাটি সম্পূর্ণ দ্রবীভূত হয়ে যদি ঘোলাটে দ্রবণ তৈরি করে তবে নমুনাটিকে প্রকৃত এসএসপি সার হিসেবে বিবেচনা করা যাবে। আংশিক দ্রবীভূত হয়ে যদি ঘোলাটে দ্রবণ তৈরি করে এবং তলানি জমা পড়ে তবে তাকে ভেজাল ভাবতে হবে। আসল এসএসপি সার আঙুলের চাপে সহজে ভেঙ্গে যাবে এবং সহজে না ভাঙ্গলে ভেজাল মিশ্রণ থাকতে পারে বলে ধারণা করা যেতে পারে।
ডিএপি সার : এক দু'চামচ ডিএপি সার একটি কাগজে খোলা অবস্থায় রেখে দিলে যদি ভিজে না ওঠে তবে সার ভেজাল। আসল ডিএপি সার হাতের মুঠোয় নিয়ে মুঠো বন্ধ করলে মুঠো ঘেমে যাবে। না ঘামলে ভেজাল মনে করতে হবে। অল্প পরিমাণ ডিএপি সার গরম করলে এক মিনিটের মধ্যে এ্যামোনিয়ার ঝাঁঝালো গন্ধ হয়ে তা গলে যাবে। তা না হলে নমুনাটি ভেজাল।
এমওপি সার/পটাশ সার : আধা গ্লাস পানিতে এক চামচ পটাশ বা এমওপি সার মেশালে গলে পানির সাথে মিশে যাবে। তলানি থাকলে মনে করতে হবে সারে ভেজাল আছে। ভেজাল এমওপি সারের লাল রঙ হাতে লেগে যাবে।
এনপিকেএস বা মিশ্র সার : ভেজাল মিশ্র সার আঙুল দিয়ে চাপ দিলে সহজেই গুঁড়ো হয়ে যাবে। ভেজাল মিশ্র সারের দানার ভেতর ও বাহিরের প্রলেপের রঙ আলাদা হয়।
বোরন : আধা গ্লাস পরিস্কার ঠাণ্ডা পানিতে এক চামচ বরিক এসিড দ্রবীভূত করলে প্রকৃত বরিক এসিডের নমুনা সম্পূর্ণ গলে যাবে। গ্লাসে তলানি জমবে না। আসল বোরন সারে তাপ দিলে খইয়ের মত ফুটবে আর যদি না ফুটে বুঝতে হবে সারে ভেজাল আছে।
অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃষকদের প্রতারিত করছেন ভেজাল সার বিক্রি করে। এতে দেশের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কৃষকদের যদি উল্লেখিত পদ্ধতিগুলো জানা থাকে তাহলে তারা আসল নকল বুঝে সার কিনতে পারবেন।
_মো. রফিকুল ইসলাম খান, অতিরিক্ত কৃষি অফিসার, নরসিংদী

কম খরচে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট আরডিআরএস উদ্ভাবিত

Baio gas plant

 

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিশ্ব ভারসাম্যহীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের ক্ষতিগ্রস- দেশের মধ্যে অন্যতম। বেশ কয়েক বছর ধরে গাছপালা লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করে পরিবেশ রক্ষা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু বর্ধিত মানুষের চাহিদা মেটাতে কোনভাবেই গাছকে রক্ষা করা যাচ্ছে না। জ্বালানি সমস্যা মেটাতেই সবচেয়ে বেশি বন ধ্বংস হচ্ছে। গাছপালা কমে যাওয়াতে গ্রামের মানুষ জ্বালানির জন্য খুব বেশি নির্ভর হয়ে পড়ছে গোবরের উপর। এক সময় যে গোবরের একটা বড় অংশ কৃষিজমির উর্বরতায় ব্যবহার হত, এখন তার প্রায় সবটাই জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বাতাসে কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে, অন্যদিকে মাটির উর্্বরাশক্তি আশংকাজনকহারে কমে যাচ্ছে। এই অবস্থার থেকে পরিত্রাণ পেতে বায়োগ্যাস প্রযুক্তি বাস-বায়নে বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশও অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।
সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এই প্রযুক্তি বাস-বায়নে এগিয়ে আসছে। আরডিআরএস কয়েক বছর ধরে বায়োগ্যাস প্রযুক্তি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রকল্পে বাস-বায়ন করে আসছে। গোবর থেকে বায়োগ্যাস প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ একদিকে যেমন রান্না-বান্না করতে পারছে, বাল্ব জ্বালিয়ে আলোর ব্যবস্থা করতে পারছে; পাশাপাশি গোবর থেকে গ্যাস ব্যবহারের পর সেই গোবর (স্লারি) অত্যন- উন্নতমানের জৈব সার হচ্ছে, যা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে মোট গোবরের ২৫-৩০ ভাগ দাহ্য গ্যাসে রূপান-রিত হয়। অবশিষ্ট ৭০-৭৫ ভাগ গোবর জৈব সার হিসাবে আহরণ করা যায়, যা তুলনামূলকভাবে সাধারণ গোবর সার থেকে উৎকৃষ্ট। বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের গ্যাস ব্যবহারের পর যে গোবর সার বেরিয়ে আসে তা স্লারি (ভেজা গোবর) হিসাবে জমিতে ব্যবহার করলে জমিতে নাইট্রোজেনের কার্যকারিতা একশত ভাগ পাওয়া যায়। এই স্লারিতে (ভেজা গোবর সার) কোন গন্ধ থাকে না এবং মাছি বা পোকার উপদ্রব হয় না।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল এর নির্মাণ এবং বাস-বায়ন খরচ। একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করতে ২৫-৩০ হাজার টাকা খরচ হয় যা গ্রামের একটি গরিব পরিবারের পক্ষে বহন করা একেবারেই অসম্ভব। এর নির্মাণ খরচ কমানোর জন্য আরডিআরএস বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে নিরবাচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে আসছে এবং অত্যন- সফলভাবে মাত্র ১২ হাজার টাকার মধ্যে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বাস-বায়নে সমর্থ হয়েছে_ যা আডিআরএস মডেল বায়োগ্যাস নামে পরিচিত। আরডিআরএস প্রথমে বাজারের তৈরি সেনেটারি ল্যাট্রিনের জন্য নির্মিত রিং স্লাব দিয়ে ৪রিং বিশিষ্ট আরডিআরএস মডেল বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করে, যাতে মোট খরচ হয় ১৮ হাজার টাকা। এই প্ল্যান্টে সমপরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায় যা বর্তমানে বেশ কয়েকজন কৃষকের বাড়িতে ব্যবহার হচ্ছে। আরো ব্যয়ভার কমানোর লক্ষ্যে পরবর্তিতে আরডিআরএস ২রিং বিশিষ্ট বায়োগ্যাস মডেল তৈরি করে। আরসিসি মালামাল দ্বারা নির্মিত এই বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট চার ফুট ব্যাসে তৈরি। সেক্ষেত্রে প্রতিটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের জন্য খরচ হয় ১৭ হাজার টাকা। এই প্ল্যান্ট থেকেও সমপরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায় যা চরাঞ্চলে কৃষকের বাড়িতে ব্যবহৃত হচ্ছে। পরবর্তিতে আরো ব্যয়ভার কমানোর লক্ষ্যে আরডিআরএস ১রিং বিশিষ্ট বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করতে সমর্থ হয়, যা তৈরিতে বর্তমান বাজারে খরচ হয় মাত্র ১২ হাজার টাকা। আরডিআরএস বর্তমানে এই প্ল্যান্ট চরাঞ্চলে জলবায়ুজনিত প্রকল্পে সমপ্রসারণ করছে। এই প্ল্যান্টের বিশেষত্ব হচ্ছে প্রতিটি প্ল্যান্ট ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি ব্যাস যার গ্যাস ডোমও ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি। এটি ফেরোসিমেন্ট মালামাল দিয়ে তৈরি। এই প্ল্যান্ট থেকেও একই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায়। এই বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের স্থায়ীত্বও বেশি। যেহেতু ১২ হাজার টাকার মধ্যে একই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যেতে পারে তাই এ রকম বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন সম্ভব হচ্ছে। আরডিআরএস উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে এই বছর সমপ্রসারণ করবে। যাদের চারটি গরু আছে তারা ঋণের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি নিজেদের বাড়িতে বাস-বায়ন করে বায়োগ্যাস দিয়ে রান্নাবান্না করে পরিবেশকে রক্ষা করতে পারবে। এতে বন উজাড় হবে না এবং কৃষিজমি দিন দিন উর্্বরতা শক্তি ফিরে পাবে। এছাড়াও এই প্রযুক্তি ব্যবহারে রাসায়নিক সারের উপর চাপ কমে আসবে এবং কৃষক কম খরচে অধিক ফসল ফলাতে পারবে।
কৃষিক্ষেত্রে বর্তমানে ৮০ ভাগ জমি চাষাবাদ হচ্ছে পাওয়ার টিলার দিয়ে। যার কারণে গ্রামগঞ্জে কৃষকের বাড়িতে গরু পালনের হার অনেক কমে গেছে। একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে প্রতিদিন ৪০ কেজি গোবরের প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে ৪-৫টি গরু থাকা প্রয়োজন। বেশিরভাগ কৃষকের বাড়িতে ৪-৫টি গরু নেই। সেদিক বিবেচনা করে আরডিআরএস গোবরের বিকল্প উৎস বের করতে গবেষণা করে একটি বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে। শুধু পচনশীল আবর্জনা (সবজি ও ফলমূলের অবশিষ্টাংশসহ ইত্যাদি পচনশীল দ্রব্য) থেকেও বায়োগ্যাস পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে ১২০ কেজি এরকম অবর্জনা দিয়েও কোন গোবর ছাড়াই একই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি কিছু গোবর এবং কিছু আবর্জনা দিয়েও (যেমন ৩০ কেজি গোবর এবং ৯০ কেজি আবর্জনা) একই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া সম্ভব।
কম খরচে বায়োগ্যাস উৎপাদনের আরডিআরএস এর এই উদ্ভাবন বাংলাদেশের প্রত্যন- অঞ্চলের কৃষককে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বাস-বায়নে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এই প্রযুক্তি সমপ্রসারণে আরডিআরএস যে কোন সরকারি/বেসরকারি/দাতা সংস্থা/ব্যক্তিকে কারিগরী সহায়তা দিতে প্রস্তুত। আমরা আশা করি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যায় আরডিআরএস উদ্ভাবিত এই মডেল ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
_এম জি নিয়োগী, হেড অব এগ্রিকালচার
আরডিআরএস বাংলাদেশ

সুস্বাদু নতুন ফল 'লনগান'

longan

রসে টই-টুম্বুর, তামাটে রঙ, মাঝারী আকারের, গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে 'লনগান'। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে সবচেয়ে সুস্বাদু ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম 'লনগান' এবার বিজ্ঞানীদের তালিকায় যোগ হল। ১৯টি দেশের ৪২টি বিদেশি ফলগাছের সাথে এবার জাদুঘরে স্থান পেল এ ফলটি। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে 'লনগান' বাংলাদেশে আসে ১৯৯৭ সালে এবং হাইব্রিড লনগান এসেছে ইন্দোনেশিয়ার বোগর এবং আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে। বাংলাদেশে নিয়ে এসেছেন বাকৃবির অধ্যাপক ও বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক ড. এম.এ. রহিম।
ড. রহিম জানান, স্বাদ ও গন্ধে এটি একটি উৎকৃষ্ট ফল। পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু ফলের মধ্যে এটি অন্যতম। যারা খেয়েছেন, তাদের কাছে অত্যন- প্রিয়। এদেশে এ ফলটি সহজেই জন্মে। তারপরও সাধারণ মানুষের কাছে ফলটি নাম এখনো পেঁৗছায়নি। 'লনগান' একটি লিচু পরিবারের ফল। বাংলাদেশের সব জেলাতেই কম-বেশি লিচু চাষ হয়। বিশেষ করে দিনাজপুর, পাবনা জেলার ঈশ্বরদী, রাজশাহী, যশোর, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে। লনগান এই জেলাগুলোতে বাণিজ্যিকভিত্তিতে চাষ করা যাবে।
ড. রহিম আরো জানান, উন্নত লনগানের ফল তুলনামূলকভাবে ছোট, ১.৫-৩ সে.মি. চওড়া, গোলাকার, চামড়া পাতলা, চামড়ার উপরের অংশ সামান্য খয়েরী-হলুদাভ রঙয়ের, শাঁস ৬০-৭৫ ভাগ এবং বীজের পরিমাণ ৪০-২৫ ভাগ।
খুব অল্প জাতে ২০-৩০ ভাগ বীজ ধারণ করে। ফলের ওজন ২০-৪০ গ্রাম। ফল মাঝারী আকারের, কিঞ্চিৎ চ্যাপ্টা, মিষ্টি, রসালো ও সুমিষ্ট গন্ধযুক্ত। মিষ্টতা ১৫-২৫ ভাগ। বীজের চারদিকে সাদা রঙের নরম, রসালো ও পুরু একটি আবরণ থাকে, যাকে এরিল বলে। এই অংশই আমরা খেয়ে থাকি। সাধারণত একটি বয়স্ক গাছে ৪০-১০০ কেজি ফল পাওয়া যায়।
জার্মপ্লাজম সেন্টারের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শামসুল আলম মিঠু জানান, লনগান ফলে পুষ্টিমান লিচুসহ অন্যান্য অনেক ফলের তুলনায় বেশি। এর প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে রয়েছে প্রোটিন ১ গ্রাম, চর্বি ০.৫ গ্রাম, শর্করা ২৫.২ গ্রাম, অাঁশ ০.৪ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২ গ্রাম, ফসফরাস ৬ মিলিগ্রাম, লৌহ ০.৩ গ্রাম, এসকোরবিক এসিড ৮ গ্রাম, ভিটামিন-এ ২৮ আইইউ। এ ছাড়াও অন্যান্য ভিটামিনসমূহ রয়েছে ০.১১ মিলিগ্রাম। বাংলাদেশে এ ফলের চাষ বাণিজ্যিকভাবে শুরু করলে দেশের একদিকে যেমন ফলের চাহিদা পূরণ হবে তেমনি রফতানি করেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

হলুদ ও মরিচের সাথে তুলা চাষ

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই কাপড়ের ব্যবহার হয়ে আসছে। এই কাপড়ের প্রধান উপাদান হল তুলা। তুলা উৎপাদনে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য থাকলেও ঔপনিবেশিক শাসনামলে বিশ্বখ্যাত মসলিনসহ উন্নতমানের বস্ত্র উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের অন্যতম প্রধান এলাকায় তুলাচাষ বিলুপ্ত হয়ে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের উৎপাদিত পাহাড়ি তুলার অাঁশ খাটো এবং মোটা হওয়ার কারণে তা আধুনিক বস্ত্রশিল্প থেকে বাদ পড়ে। আর সে কারণেই বস্ত্রশিল্প সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর কাঁচা তুলার অভাবে দেশের বস্ত্রশিল্প মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকার সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ হিসেবে দেশে আমেরিকান জাতের তুলা চাষের প্রবর্তন ও সমপ্রসারণের জন্য ১৯৭২ সালে তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে। ১৯৯১ সাল থেকে তুলা উন্নয়ন বোর্ড তুলার বিভিন্ন বিষয়ের ওপর গবেষণা পরিচালনা করে আসছে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ৫টি গবেষণা কেন্দ্রে_ প্রজনন, কৃষিতত্ত্ব, মৃত্তিকা বিজ্ঞান, কীটতত্ত্ব ও রোগতত্ত্ব ডিসিপ্লিনে আমেরিকান তুলার ২০টি ও পাহাড়ি তুলার ওপর ১৩টি গবেষণা কার্যক্রম বাস-বায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জোনে মোট ২২টি অন-ফার্ম ট্রায়াল স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে কাঁচা তুলার চাহিদা রয়েছে প্রায় ১৫ লক্ষ বেল। সেখানে দেশে উৎপাদন হয় মাত্র ১ লক্ষ বেল। বাকি ১৪ লক্ষ বেল দেশের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে প্রতি বছর বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে উৎপাদিত তুলা দিয়ে এ চাহিদার শতকরা ৭ থেকে ৮ ভাগ পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে তুলা গবেষণা, বীজ উৎপাদন ও বিতরণ, বাজারজাতকরণ ও জিনিং এবং সমপ্রসারণের ব্যাপক কর্মসূচি সরকার গ্রহণ করেছে। আরো আশার কথা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলাতে বর্তমানে সাথী ফসল হিসেবে তুলার চাষ শুরু হয়েছে। তবে উন্নতজাতের হাইব্রিড বীজের দুষপ্রাপ্যতা ও উচ্চমূল্যের কারণে তুলা চাষিরা রীতিমত দিশেহারা।
তুলার বাজারমূল্য নিয়েও তারা শংকিত। এবছর তুলা উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়া জোনের অধীন রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি ও জামালপুর ইউনিটের আওতায় ২৪৭ হেক্টর জমিতে তুলার চাষ হচ্ছে। এর সাথে প্রায় ১১শ' কৃষক সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে। গত বছর দেশীয় জাতের তুলার আবাদ করে পোকার আক্রমণসহ আশানুরূপ ফলন না পেয়ে অনেকেই এবার নতুন করে হাইব্রিডজাতের তুলার আবাদ শুরু করেছে। চায়না থেকে আমদানিকৃত প্রতি কেজি এ তুলা বীজের বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার টাকা। অথচ সরকারিভাবে সরবরাহকৃত সাধারণ জাতের তুলা বীজের প্রতি কেজি বাজার মূল্য মাত্র ১৫ টাকা। দেশীয় এবং হাইব্রিডজাতের বীজের এই আকাশচুম্বী ব্যবধান ও দুষপ্রাপ্যতার কারণে লাভজনক তুলা চাষে আগ্রহী অনেক চাষিই এখন দিশেহারা।
মরিচ ও হলুদের জমিতে নতুন করে নিড়ানি না দিয়েই বাড়তি কিছু সার প্রয়োগের মাধ্যমে নূ্যনতম খরচে তুলাচাষ করে কৃষকরা ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছে। প্রতিবিঘা জমিতে আট থেকে নয় মণ স্থানীয় জাতের তুলার ফলন হলেও একই জমিতে ১৪ থেকে ১৫ মণ হাইব্রিডজাতের তুলার ফলন হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় জাতের তুলনায় হাইব্রিডজাতের তুলার বাজারমূল্যও প্রায় বেশ কয়েক গুণ বেশি। পোকার আক্রমণ নেই বললেই চলে। সব মিলিয়ে পুরাতন তুলা চাষিরা আর কেউই স্থানীয় জাতের তুলা চাষে মোটেই আগ্রহী নয়। তারা ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছে হাইব্রিডজাতের তুলা চাষে।
বস্ত্র শিল্পের প্রধান কাঁচামাল যোগানদানকারী ফসল তুলার বীজ হতে তেল ও খৈল, অপরিশোধিত তেল থেকে সাবান তৈরি এবং পরিশোধিত তেল ভোজ্য তেল হিসেবে ব্যবহারসহ তুলার বহুবিধ ব্যবহার চাষিদের মধ্যে তুলাচাষে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করেছে।
কুষ্টিয়া জোনের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র দেবনাথ জানান, স্থানীয় জাতের তুলায় পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি। কিন্তু হাইব্রিডজাতের তুলার আবাদ করলে স্পটেড বোল-ওয়ার্ম পোকার আক্রমণ হয় না। ফলে কীটনাশক খরচ কম হয় এবং তুলার ফলন প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ায় চাষিরা হাইব্রিড জাতের তুলা চাষে আগ্রহ ও উৎসাহ দেখাচ্ছে।
এ এলাকায় হলুদ ও মরিচের সাথে সাথী ফসল হিসেবে তুলাচাষ করে চাষিরা ব্যাপকভাবে লাভবান হওয়ায় আগামীতে এখানে চাষাবাদ আরো বাড়বে। একই ধরনের আশাবাদ কৃষকদেরও। তবে তাদের দাবি হাইব্রিড বীজের মূল্য হ্রাস করার পাশাপাশি তুলার বাজারমূল্য দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায় উন্নীত করা হলে এ অঞ্চলে তুলাচাষ ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়বে।

জৈব পদ্ধতিতে পোকামাকড় দমন

রাসায়নিক বালাইনাশক ও কীটনাশক সব সময়ই ক্ষতিকর। এর বিষক্রিয়া শুধু ক্ষতিকর পোকা ও বালাইকে ধ্বংস করে না; ধ্বংস করে বেশকিছু উপকারী পোকাও। কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় মানুষের দেহে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। অথচ কিছু প্রাকৃতিক দ্রব্য ব্যবহার করে কোন পাশর্্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়া আমরা রোগ ও ক্ষতিকর পোকার হাত থেকে রক্ষা করতে পারি আমাদের ক্ষেতের ফসল। এতে খরচ যেমন কম হয় তেমনি সাশ্রয় হয় অর্থেরও।
গাছ সুস্থ রাখতে কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শস্য পর্যায় এবং সম্পূরক ফসলের মিশ্রণের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়। ক্ষতিকর পোকা দমন করতে পেঁয়াজ, রসুন, পুঁদিনা ইত্যাদির গাছ জমির চারপাশে আবাদ করতে হবে। এতে ক্ষতিকর ফসলের পোকা পেঁয়াজ, রসুন, পুঁদিনা গাছে জমা হয় যা হাতে বা হাতজাল দিয়ে সংগ্রহ করে মেরে ফেলা যায়। তা ছাড়া গাছের রোগাক্রান- অংশ পুড়িয়ে ফেলেও রোগ অনেকাংশে দমন করা সম্ভব।
কাঠ পোড়া ছাই : রান্নার পর চুলার ছাই পোকা দমনে বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে। যেসব পোকা বুকে ভর করে চলাচল করে তাদের ছাই দিয়ে দমন করা যায়। মূলা, পেঁয়াজ, বাঁধাকপি ও সরিষার মূলে যেসব শুককীট থাকে তা দমনে ছাই খুবই কার্যকর। এ ছাড়া কুমড়ার গোবর পোকা দমন করতে সমপরিমাণ ছাই ও গুঁড়ো করা চুন সাবান পানিতে মিশিয়ে ছিটানো যায়।
ভেষজ উদ্ভিদ : টমেটো গাছের পাতা ও কাণ্ড ক্ষতিকর পোকা দমনে বেশ কার্যকর। এর পাতা ও কাণ্ড সিদ্ধ করার পর পানি ঠাণ্ডা করে ফসলে সপ্রে করলে লেদা, কালো সবুজ মাছি সফলভাবে দমন করা যায়। নিমপাতা উদ্ভিদজাতনাশকের মধ্যে বেশি কার্যকর। বীজ সংরক্ষণ ও আলু গুদামজাত করতে শুকনো নিমপাতা ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া ১ কেজি নিমপাতা ৮ কেজি পানিতে ২০ মিনিট সিদ্ধ করে প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। এতে প্রায় সব ধরনের পোকাই দমন হয়। ল্যানটানা গাছের ডাল পুরোপুরি শুকিয়ে নিয়ে ছাই করে প্রয়োগ করলে গোবর পোকা ও পাতা ছিদ্রকারী পোকা দমন হয়। তামাক গাছ এবং তার ডাটা পানিতে ৪দিন ভিজিয়ে রেখে সপ্রে করলে সুফল পাওয়া যায়। এ ছাড়া তামাক পাতার সঙ্গে রসুন, পেঁয়াজ এবং পুঁদিনা এক সাথে গুঁড়ো করে এ সবের মিশ্রণ ১:৫০ থেকে ১:১০ অনুপাতে পানির সঙ্গে মিশিয়ে সপ্রে করতে হবে। এতে সব ধরনের ক্ষতিকর পোকা দমন করা সম্ভব। তাছাড়া পেঁয়াজ, রসুন, সরিষা ও মরিচ গাছ একসাথে টুকরো টুকরো করে কেটে পানিতে মিশিয়ে এক সপ্তাহ পচিয়ে তা আক্রান- গাছে প্রয়োগ করলেও সুফল পাওয়া যায়।
দশ শতাংশ ধানের জমিতে ধানের পামরি পোকা দমনের জন্য এক কেজি নিম বীজ দেড় লিটার পানিতে ভিজিয়ে রেখে নির্যাস তৈরি করা যায়। নির্যাস পাতলা ঘনত্বে প্রয়োগ করা উত্তম। দশ কেজি বীজ থেকে তৈরি ১৫ লিটার তরল নিম বীজ নির্যাস আরো ৯০ লিটার পানি যোগ করে এক একর জমিতে সহজে ছিটানো যায়। নির্যাস সপ্রে মেশিনের সাহায্যে পাতায় উভয় প্রান-ে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
আতা ও শরিফা গাছের বিভিন্ন অংশ কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। গাছের পাতা, বীজ ও অপরিপক্ক শুকনো ফলের মিহি গুঁড়ো কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ধানের বাদামি গাছ ফড়িং, ঘাস ফড়িং, সবুজ গান্ধি পোকা, সবুজ পাতা শোষক পোকা ও সাদা পিঠ পাতা শোষক পোকা, আলুর জাপ পোকা, শাক-সবজির জাব পোকা, শসা-কুমড়ার লাল পোকা ও বাঁধাকপির ডায়মন্ড ব্যাকমথ এসব পোকা দমনে এ ফল গাছের অংশসমূহ ব্যবহার করা হয়। কীটনাশক আমাদের মাটির উর্বরাশক্তি কেড়ে নিয়ে জমিকে করে তুলছে অনাবাদি। তাই আমাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দরকার পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণ।

কুল চাষ

184464_1

কুলের ফলন বিপর্যয়
কম সময়ে কম মুনাফা দিয়ে অধিক লাভবানের জন্য বাণিজ্যিকভাবে কুল চাষের জুড়ি নেই। এছাড়া বিভিন্ন ফল বাগানের পাশপাশি মিশ্রফল হিসেবে কুলের আবাদ করা যায় বলে দিন দিন এর চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে কুল চাষ লাভজনক হলেও কুলের মৌসুমে চাষিরা হতাশ। কোন কোন কুল গাছে ফুল অসেনি, কোথাও ফুল এসে ফল আসেনি, এমনি নানা সমস্যার কারণে এবার ফলন ৫০ ভাগ কম হতে পারে বলে মনে করছেন চাষিরা। বিশেষজ্ঞরা ফলন কম হওয়ার জন্য চারটি কারণকে দায়ী করেছেন_
আগাম ডাল ছাঁটাই : মৌসুমে কুল না আসার কারণে কুল চাষিরা সাধারণত ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই অধিকাংশ কুল গাছের ডাল ছাঁটাই করেন। ফলে দেখা যায়, ডাল কাটার পর যে নতুন শাখা বের হয় সেগুলোর বয়স ছয় মাসের বেশি হয়ে যায়। এতে শাখা-প্রশাখার বৃদ্ধি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পুরানো শাখা-প্রশাখা প্রতিটি পত্রকক্ষে কম পরিমাণে ফুল আসে। গবেষণার ফলাফল হতে দেখা গেছে, কুল গাছের ৯৮% ফুল আসে নতুন ডগায় আর মাত্র ২% ফুল আসে পুরাতন শাখায়। সুতরাং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ডাল ছাঁটাই করতে হবে। তবে এপ্রিল মাসেও ডাল ছাঁটায়ের কাজ করা যায়। একটি কথা মনে রাখতে হবে, কুল গাছে কুল আসুক বা না
আসুক নির্দিষ্ট সময়েই গাছের ডাল ছাঁটাই করতে হবে অথবা কুল সংগ্রহের পর কুল গাছে নতুন পাতা বের হওয়ার আগেই ডাল ছাঁটায়ের কাজ শেষ করতে হবে।
সুষম সার প্রয়োগ : আমাদের দেশে জন্মানো গুটি জাতগুলো কোন রকম যত্ন ছাড়াই আশানুরূপ ফলন দিয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদকৃত উচ্চফলনশীল আপেল কুল, বাউকুল, থাইকুল, বারি কুল-১, বারি কুল-২, কুমিল্লা কুল, খুরমা কুল, ঢাকা-৯০ ইত্যাদি জাতগুলোর ফলন সুষম সার ব্যবস্থপনার উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ সুষম সার ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ জাতগুলোর আশানুরূপ ফলন পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু কুল চাষিরা তাদের কুল বাগানে অসম ও অপর্যাপ্ত সার ব্যবহার করে থাকেন। ফলে কুলের ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। অন্যান্য ফলগাছের মত কুলগাছে সাধারণত জৈব সার, ইউরিয়া সার, ট্রিপল সুপার ফসফেট, মিউরিয়েট অব পটাশ, জিপসাম, জিংক সালফেট ও বোরণ সারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অধিকাংশ কুলচাষিরা ইউরিয়া সার, ট্রিপল সুপার ফসফেট, মিউরিয়েট অব পটাশ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে গোবর সার ও বোরণ সার ব্যবহার করে থাকেন। ফলে প্রতি বছরই আশনুরূপ ফলন হতে তারা বঞ্চিত হন। সার প্রয়োগের পর প্রয়োজন হলে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
ফুল ফুটন- অবস্থায় কীটনাশক সপ্রে : কুলের পরাগায়ণ বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ দ্বারা সম্পন্ন হয়। কুলগাছে ফুল ফোটা হতে শুরু করে শেষ হতে ৪৫-৬০ দিন পর্যন- সময় লাগে। এ সময় কুল বাগানে বিভিন্ন ধরনের মৌমাছি, মাছি, পিঁপড়াপ্রজাপতিসহ বিভিন্ন কীটপতঙ্গ আসে। এ সমস- কীটপতঙ্গ ফুলের পরাগায়ণের সহায়ক হিসেবে কাজ করে থাকে। এ সময়ে কুল বাগানে কোন ধরনের কীটনাশক সপ্রে করা উচিত না। তবে সুনির্দিষ্ট কিছু সমস্যার জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী বিকেল বেলায় সপ্রে করা যেতে পারে। কিন্তু কুল চাষিরা ফুল ফুটন- অবস্থায় ২-৩ বার বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক সপ্রে করে থাকেন ফলে পরাগায়ণ হয় না।
আবহাওয়াগত কারণ : কুলগাছে ফুল ফুটন- অবস্থায় উচ্চতাপমাত্রা, অতিবৃষ্টি, দিন-রাতের তাপমাত্রার তারতম্যে বেশি কুল হয় না। ফলে স্থানভেদে কুলের ফলনের তারতম্য হয়ে থাকে।
সঠিক সময় সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অবশ্যই আশানুরূপ ফলন পাওয়া যাবে।
_মোঃ শরফ উদ্দিন (রাজন), বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা,
আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, চাঁপাইনবাবগঞ্জ